| |

Ad

জাপা ফের ভাঙনের মুখে

আপডেটঃ ৫:১৩ অপরাহ্ণ | সেপ্টেম্বর ০৫, ২০১৯

ডেস্ক নিউজঃ সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার পদ দখল নিয়ে কাদের-রওশন কাড়াকাড়ির মধ্যে ফের ভাঙনের মুখে পড়েছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। জি এম কাদের ও রওশন এরশাদ দুজনই নিজেকে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা দাবি করে স্পিকারকে চিঠি দেয়ার পর এখন পার্টির চেয়ারম্যান পদ নিয়ে শুরু হয়েছে টানাটানি। বিষয়টি নিয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতা ও সংসদ সদস্যরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের মৃত্যুর পর তার নির্দেশনা অনুযায়ী চেয়ারম্যান হন জি এম কাদের। তাৎক্ষণিক রওশন তা প্রত্যাখ্যান করলেও কোনো পদক্ষেপ নেননি। কিন্তু এরশাদের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া রংপুর-৩ আসনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে লেজেগোবরে অবস্থার মধ্যে গত ৩ সেপ্টেম্বর জি এম কাদের নিজেকে বিরোধীদলীয় নেতা মনোনীত করলে রওশন ও তার সমর্থকদের ক্ষোভের আগুনে ঘি পড়ে। বিরোধীদলীয় নেতা হওয়ার অভিলাষ জানিয়ে পরদিন ৪ সেপ্টেম্বর স্পিকারকে চিঠি দেন রওশনও। আর বৃহস্পতিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সংবাদ সম্মেলন করে জাপার চেয়ারম্যান হিসেবেও নিজের নাম ঘোষণা করেন রওশন।

অবশ্য রওশনের পদক্ষেপের দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে কাদের বলেছেন, রওশনের বিরুদ্ধে পার্টির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। দুদিন ধরে চিঠি, পাল্টা চিঠি এবং জি এম কাদের-রওশন এরশাদের পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন ও পদক্ষেপের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় পার্টির ভাঙন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

রাজধানীর গুলশানে নিজ বাসভবনে সংবাদ সম্মেলন ডাকেন রওশন এরশাদ। যেখানে তাকে পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন তার অনুসারী নেতা আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। সংবাদ সম্মেলনে রওশন বলেন, এইচ এম এরশাদ তিলতিল করে পার্টিকে গড়ে তুলেছেন। এখন সেই পার্টিকে ভালো করতে চাই। অতীতে যারা জাতীয় পার্টি ছেড়ে গেছেন, তাদের নতুন করে দলে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান রওশন। তিনি বলেন, মান-অভিমান ভুলে দেশ ও মানুষের স্বার্থে জাতীয় পার্টির পতাকাতলে আসুন। সবাই একসঙ্গে কাজ করলে জাতীয় পার্টিকে অনেক দূর এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে। রওশন এরশাদ বলেন, পার্টিতে কী হচ্ছে? জাতীয় পার্টি কী আবার ভাঙতে যাচ্ছে? অতীতে কিন্তু জাপা ভেঙেছে। আসুন সবাই মিলে পার্টিকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করি।

এ সময় আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, জি এম কাদের পার্টির কো-চেয়ারম্যান হিসেবে থাকবেন। যে প্রক্রিয়ায় তিনি নিজেকে পার্টির চেয়ারম্যান দাবি করছেন, সে প্রক্রিয়ায় গলদ রয়েছে। এরশাদের অসুস্থতা ও মৃত্যুর কারণে আমরা এ নিয়ে প্রশ্ন তুলিনি। জি এম কাদের পার্লামেন্টারি বোর্ড গঠনে গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করেছেন। গঠনতন্ত্রে স্পষ্ট বলা আছে- চেয়ারম্যান, মহাসচিবের বাইরে পার্লামেন্টারি বোর্ডে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সাত সদস্য থাকবেন। তিনি যা করেছেন, সবই অবৈধ। এতে অবশ্য পার্টি ভাঙবে না বলে মন্তব্য করেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।

সংবাদ সম্মেলনে সিনিয়র নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- সংসদ সদস্যদের মধ্যে গোলাম কিবরিয়া টিপু, মজিবুল হক চুন্নু, নাসিম ওসমান, ফখরুল ইমাম, লিয়াকত হোসেন খোকা ও নুরুল ইসলাম ওমর। প্রেসিডিয়াম সদস্য এসএম ফয়সল চিশতী, মীর আবদুস সবুর আসুদ, সফিকুল ইসলাম সেন্টু ও সোহেল রানা।

অন্যদিকে রওশন এরশাদের সংবাদ সম্মেলনের দুই ঘণ্টা পর পার্টির বনানী কার্যালয়ে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেন জি এম কাদের। এ সময় তিনি বলেন, রওশন এরশাদকে সম্মান করি। যতটুকু শুনেছি, তিনি নিজে থেকে নিজের কথা বলেননি। তিনি আরো বলেন, শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এটা নিয়ে অস্থির হওয়ার কিছু নেই। জাপা ভাঙেনি। কোনো ভাঙনের মুখে পড়েনি। যে কোনো ব্যক্তি কোনো ঘোষণা দিলেই তো তা বাস্তবায়ন হয় না।

গঠনতন্ত্রের ২০/ধারা ক উপধারার উদ্ধৃতি করে জি এম কাদের বলেন, এইচ এম এরশাদ আমাকে তার অবর্তমানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করতে নির্বাচিত করেছেন। গঠনতন্ত্রের ২০ ধারার ক উপধারায় বলা আছে, চেয়ারম্যান জাপার যে কোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ ও নিজের স্থলাভিষিক্ত করতে পারবেন। এইচ এম এরশাদ আমাকে তার স্থলাভিষিক্ত করে গেছেন। মৃত্যুর আগে আমাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। মৃত্যুর পর কী হবে সেটা গঠনতন্ত্রে বলা নেই।

কাদের জানান, এরশাদের মৃত্যুর পর প্রথম প্রেসিডিয়ামের বৈঠকে তাকে চেয়ারম্যান হিসেবে অভিনন্দিত করা হয়। তিনি আরো জানান, কাউন্সিল ছাড়া অন্য কাউকে স্থলাভিষিক্ত করা যাবে না। তার (এইচ এম এরশাদ) অবর্তমানে আমাকে স্থলাভিষিক্ত করে গেছেন। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নাকি চেয়ারম্যান তা এরশাদই বলে গেছেন। জি এম কাদের বলেন, দলের সংসদ সদস্যদের কাছে জানতে চেয়েছি কার প্রতি তাদের আস্থা আছে। ২৫ জনের মধ্যে ১৫ জনই আমার পক্ষে রয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতার পদ পাওয়া প্রসঙ্গে জি এম কাদের বলেন, আমরা যা করেছি তা আইনসম্মতভাবে করেছি। গঠনতন্ত্র মোতাবেক করেছি। কাউকে ছোট করার জন্য করিনি। সংবাদ সম্মেলনে জাপার সাবেক মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, সৈয়দ আবু হাসান বাবলা ও মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এরশাদ মানে জাপা, জাপা মানে এরশাদ। আমি প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে দলে আছি। তিনি (এরশাদ) কিন্তু জি এম কাদেরকে তার অবর্তমানে চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করেছেন। আমরা রওশন এরশাদকে সম্মান করি, তিনি যা করেছেন তা নিয়ে আমরা কিছু বলব না।

এদিকে রওশন এরশাদকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণার পর তার স্বাক্ষর ছাড়া অন্য কারো স্বাক্ষর গ্রহণ না করতে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছে জাপার একাংশ। বৃহস্পতিবার বিকেলে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) কার্যালয়ে এ চিঠি পৌঁছে দেয়া হয়। রওশনপন্থিদের অন্যতম নেতা দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাংসদ ফখরুল ইমাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। অন্যদিকে জি এম কাদের জাপার চেয়ারম্যান, তার স্বাক্ষর ছাড়া অন্য কারো স্বাক্ষর গ্রহণ না করতে কাদেরপন্থিদের একটি চিঠি বেশ কয়েকদিন আগেই ইসিতে জমা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির দপ্তর সম্পাদক সুলতান আহমেদ। তিনি জানান, অনেক আগেই জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে পার্লামেন্টারি বোর্ড গঠন করে ইসিতে চিঠি জমা দেয়া হয়। সুতরাং তার স্বাক্ষর ছাড়া কারো স্বাক্ষর গ্রহণ করতে পারবে না ইসি।

চিঠি জমা দেয়ার পর ফখরুল ইমাম বলেন, দলের গঠনতন্ত্র নির্বাচন কমিশনে আগেই জমা দেয়া আছে। আমরা সুনির্দিষ্ট ধারা উল্লেখ করে জানিয়েছি এখন থেকে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন রওশন এরশাদ। দলের গঠনতান্ত্রিক নিয়মে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এখন থেকে রওশন এরশাদের স্বাক্ষর ছাড়া যেন অন্য কারো স্বাক্ষর গ্রহণ না করা হয়, এ বিষয়টি ইসিকে জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া, নিজেকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান উল্লেখ করে রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচনের জন্য পার্লামেন্টারি বোর্ড ঘোষণা করেছেন দলটির প্রয়াত চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ। তিনি আগামী রবিবার সংসদ ভবনে পার্লামেন্টারি বোর্ডের বৈঠকও ডেকেছেন। ১৩ সদস্যের এ বোর্ডে এরশাদের ভাই (জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত) জি এম কাদেরকে রাখা হয়েছে তিন নম্বর সদস্য হিসেবে। আর সদস্য সচিব করা হয়েছে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গাকে। রাঙ্গা বর্তমানে পার্টির মহাসচিব। রওশন এরশাদ স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, রুহুল আমিন হাওলাদার, মুজিবুল হক চুন্নু, কাজী ফিরোজ রশীদ, অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খান, গোলাম কিবরিয়া টিপু, ফখরুল ইমাম, সুনীল শুভ রায়, আতিকুর রহমান আতিক ও মজিবর রহমান সেন্টু।

গত ১৪ জুলাই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর চার দিন পর ১৮ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে জি এম কাদেরকে জাপার চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দেন দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা। এরপর ২৩ জুলাই জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে অস্বীকার করে বিবৃতি দেন রওশন এরশাদসহ দলের সাত জন সংসদ সদস্য ও দুই জন প্রেসিডিয়াম সদস্য। তবে, পরবর্তী সময়ে এরশাদের চেহলাম উপলক্ষে কয়েকটি মিলাদ মাহফিলে একসঙ্গে দেখা যায় রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরকে।

অবশ্য দেবর-ভাবির এই সদ্ভাব বেশি দিন টেকেনি। রংপুর-আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন ঘিরে তাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। এই আসনে প্রার্থী হতে চার রওশনপুত্র সাদ এরশাদ। রওশন শিবিরের নেতা জিয়াউদ্দিন বাবলু স্ত্রী (এরশাদের ভাগ্নি) টুম্পাও এখানে লাঙলের দাবিদার। আবার এরশাদের ভাতিজা আসিফও লাঙল পেতে মরিয়া। অন্যদিকে এরশাদ-বিদিশাপুত্র এরিখ মনোনয়নপত্র তুলেছেন স্থানীয় জাপা নেতা ইয়াসিরের। রংপুরের নির্বাচন ঘিরে এরশাদ পরিবারের চতুর্মুখী ঘূর্ণির মধ্যে পার্টির শীর্ষ পদ নিয়ে দুই শীর্ষ নেতার কাড়াকাড়িতে ভাঙনের মুখে পড়েছে জাপা।

দলীয় সূত্র জানায়, যে কোনো মুহূর্তে আসতে পারে বহিষ্কার-পাল্টা বহিষ্কারের ঘোষণা। জাতীয় পার্টিতে ভাঙন অনিবার্য হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র নেতা। তিনি বলেন, এক মাত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই পারেন জাতীয় পার্টিকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে। অবশ্য এরশাদ পরবর্তী জাতীয় পার্টি শেখ হাসিনার কাছে আগের মতো গুরুত্ব বহন করে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

ওই নেতা জানান, প্রতিষ্ঠার পর অনেকবারই ভাঙনের মুখে পড়েছে জাতীয় পার্টি। নানা মত ও পথের নেতাদের নিয়ে দল গড়েছিলেন এরশাদ। অনেকেই এসেছিলেন ক্ষমতার মধু খেতে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সেই মৌ-লোভীরা বেশিরভাগই সটকে পড়েছেন। গড়েছেন আলাদা পার্টি। তাদের কেউ কেউ বিলুপ্তও হয়ে গেছে। মূলধারাটি এরশাদের নেতৃত্বে (এখন জি এম কাদের-রওশনের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি-জাপা) থাকলেও বর্তমানে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি জেপি, প্রয়াত কাজী জাফরের নেতৃত্বে (বর্তমানে নেতৃত্বে মোস্তফা জামাল হায়দার) জাতীয় পার্টি-জাফর এবং আন্দালিব রহমান পার্থের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি সক্রিয় রয়েছে।