| |

Ad

চামড়া কেনা শেষ আড়তের , অপেক্ষা ট্যানারি মালিকদের

আপডেটঃ ৭:৪৯ অপরাহ্ণ | আগস্ট ১৬, ২০১৯

অর্থনৈতিক রিপোর্টার: পোস্তায় চামড়া কেনা শেষ। এখন ট্যানারিতে পাঠানোর অপেক্ষায়। গত তিন দিনে লাখ লাখ পিস চামড়া কেনাবেচা হয়েছে পোস্তায়। শতাধিক আড়তদার বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা চামড়া কিনে গুদাম বোঝাই করেছেন। সেই চামড়ায় লবণ মাখানোর পর এখন শুধু ট্যানারি মালিকদের অপেক্ষা করছেন আড়ৎদাররা। 
এবার চামড়ার দাম কম ও হাজার হাজার পিস চামড়া নষ্ট হওয়ায় রাস্তায় পড়ে থাকতেও দেখা গেছে। ফলে এ শিল্প প্রায় হাজার কোটি টাকা ক্ষতির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। 
গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়,  ঈদের চতুর্থ দিন পোস্তায় কাঁচা চামড়া না আসায় বিক্রেতা, আড়ৎদার ও কর্মচারীদের ব্যস্ততা না থাকলেও হতাশা ছিল ব্যবসায়ীদের চোখে-মুখে। এখনও কোনো কোনো আড়তে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে লবণ দেওয়ার কাজ চলছে। আড়তে চামড়া লবণজাত অবস্থায় থাকবে ২০ থেকে ২৫ দিন। এরপর ২০ আগস্ট থেকে পোস্তার চামড়া নেবেন ট্যানারি মালিকরা। এবার চামড়ার  দরপতনের এ পরিস্থিতির জন্য ট্যানারি ও আড়তদাররা একে অপরকে দোষারোপ করছেন। একই সঙ্গে রয়েছে নানা অব্যবস্থাপনাসহ সিন্ডিকেটের অভিযোগ।
আড়ৎদাররা জানান, চামড়া দেশের সম্ভাবনাময় একটি শিল্প। গুণগতমানের দিক থেকেও বাংলাদেশের গবাদি পশুর চামড়া উন্নতমানের। আর সে কারণে এক সময় বিদেশি বায়াররা এদেশ থেকে চামড়া কিনতো। অথচ এখন তারা বাংলাদেশবিমুখ। এর কারণ সরকারকে অনুধাবন করতে হবে। চামড়াশিল্পকে টিকিয়ে রাখা শুধু নয় বিকশিত করতে হলে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা না হলে পাটশিল্প যেমন ধ্বংস হয়ে গেছে, চামড়াশিল্পও ধ্বংস হয়ে যাবে।
এদিকে গত মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করার লক্ষে কাঁচা চামড়া রফতানির অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একইসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্ধারিত মূল্যে কাঁচা চামড়া বেচাকেনা নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা চাওয়া হয়। এর পরদিন ১৪ আগস্ট বাণিজ্যমন্ত্রণালয় ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে আগামী ২০ আগস্টের মধ্যে চামড়া কেনার অনুরোধ জানালে ট্যানারি মালিকরা সরকারের নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই চামড়া কেনার সিদ্ধান্ত নেন। তবে হঠাৎ করে সরকারের নেওয়া এ সিদ্ধান্তে এ শিল্পখাতের কোনো উপকার হবে না বলে মনে করেন আড়ৎদাররা। কারণ যা ক্ষতি হওয়ার গত কয়েকদিনেই হয়ে গেছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, পোস্তায় চামড়া কেনা শেষ। লবণ মাখানোও প্রায় শেষ। দু’একটি কারখানায় হয়তো লবণ দিচ্ছে। এখন আমরা অপেক্ষা করছি ট্যানারি মালিকরা কবে থেকে চামড়া কিনবেন। ইতিমধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাদের সঙ্গে বৈঠক করে আগামী ২০ আগস্ট থেকে লবণযুক্ত চামড়া কিনতে বলেছে। তারাও এ সিদ্ধান্তে রাজি হয়েছে। আশাকরি তারা তাদের কথা রাখবে। 
তিনি বলেন, বাজারে কোনো সিন্ডিকেট হয়নি। প্রতিবছর ট্যানারি মালিকরা সিন্ডিকেটের কথা বলেন, কিন্তু এটি সঠিক নয়। সমস্যা হয় তাদের কাছে পাওনা টাকা যখন আমরা পাই না তখনই। তারা প্রচুর টাকা বকেয়া রেখেছেন। সবার কাছে টাকা থাকলে বাজারে প্রতিযোগিতা থাকতো, ফলে চামড়ার দামও বাড়তো। এজন্য আমরা বারবার মৌসুমি ব্যবসায়ীদের বলেছি চামড়া কেনার ছয় ঘণ্টার মধ্যে লবণ দিয়ে রাখতে। যদি তারা এটা করতো তাহলে এত চামড়া নষ্ট হতো না। যে পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়েছে তাতে আনুমানিক প্রায় হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়ে গেছে এ শিল্পের।
পোস্তার আড়তদার ছমীরউদ্দিন বলেন, আমি ৩০ বছর ধরে চামড়ার ব্যবসা করি। এবারের মতো দরপতন কোনোদিনও দেখিনি। 
এবার তিনি তিন হাজার পিস চামড়া সংগ্রহ করেছেন। মান ভেদে ৩শ, টাকা থেকে ৮শ, টাকা পর্যন্ত দরে চামড়া কিনেছেন। আর চামড়াপ্রতি তার খরচ হয়েছে ২৫০ টাকা। এ খরচের মধ্যে রয়েছে লবণ মাখানো, গাড়িতে করে চামড়া আনা ও লবণ খরচ। সরকার নির্ধারিত ৪৫ থেকে ৫০ টাকা ফুট বিক্রি করতে পারলে লাভবান হবে আড়ৎদাররা।
তিনি বলেন, এবার চামড়া কম দামে কিনেও ঝুঁকিতে আছি। এখনও কোনো ট্যানারি যোগাযোগ করেনি। আশা করছি, আগামী মঙ্গলবার (২০ আগস্ট) থেকে চামড়া নেওয়া শুরু করবে ট্যানারি মালিকরা।
আড়ৎদার আজগর আলী বলেন, এতোদিন ধরে ব্যবসার সঙ্গে আছি কিন্তু এত বাজে ব্যবসা আর কখনও দেখিনি। 
এখন মাল কেনা শেষ। ট্যানারিতে সাপ্লাই দেওয়া বাকি। আগামী মঙ্গলবার থেকে ট্যানারি মাল টানা শুরু করবে। তারা যদি আমাদের নগদ টাকা না দেয় তাহলে মাঠেই মারা পড়বো আমরা।সূত্রে জানা যায়, পোস্তায় চামড়া কেনা ও চামড়ায় লবণ দেওয়া শেষ হয়েছে। এবার আড়তদাররা সরাসরি চামড়া না কেনায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দিয়ে চামড়া কিনছেন। তারা কম দামে চামড়া কেনার জন্য মৌসুমি ব্যবসায়ীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা চমড়া নিয়ে রাস্তায় বসে থাকতে বাধ্য করে। পরে চামড়া নষ্ট হওয়ার আতঙ্কে নামমাত্র দামে লোকসান দিয়ে চামড়া বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। ফলে সরকার নির্ধারণ করে দেওয়া দর অনুযায়ী লবণ মিশ্রিত চামড়া ২০ থেকে ২৪ বর্গফুটের একটি চামড়ার দাম হওয়ার কথা ৮শ, থেকে এক হাজার টাকা। সেখানে লাভের আশায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বাসা-বাড়ি থেকে চামড়া কিনেছেন ৫শ থেকে ৬শ, টাকা দরে। কিন্তু মধ্যস্বত্ত¡ভোগীদের কাছে বিক্রি করতে গিয়ে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েন তারা। আড়ৎদাররা চামড়া কেনার টাকার অভাব আর সংরক্ষণের কথা বলে বেকাদায় ফেলে দিচ্ছে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের। আর কম দামে কিনে মধ্যস্বত্বভোগীরা মুনাফা রেখেই সেই চামড়া বিক্রি করেন আড়ৎদারদের কাছে। যা পরে আড়তদাররা লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করে ট্যানারি মালিকদের কাছে সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করবে। এভাবেই চামড়ার বাজারে দরপতন হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
সরকারের নির্ধারণ করে দেওয়া দাম অনুযায়ী ঢাকায় কোরবানির গরুর প্রতিটি ২০ থেকে ৩৫ বর্গফুটের চামড়া লবণ দেওয়ার পরে ৯শ, থেকে এক হাজার ৭শ, ৫০ টাকায় কেনার কথা ট্যানারি মালিকদের। কিন্তু মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ৩শ, থেকে ৫শ, টাকায় চামড়া কিনেছেন। আর রাজধানীর বাইরে দেশের অন্য স্থানে চামড়া বেচাকেনা হচ্ছে আরও কম দামে।
এদিকে, বিক্রি করতে না পেরেই সৈয়দপুর হাফিজিয়া হোসাইনিয়া দারুল হাদিস মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ কোরবানির পশুর চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলে বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিটি। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুর সাহারপাড়া ইউনিয়নের এই মাদ্রাসাটি গত মঙ্গলবার দুপুরে চামড়াগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলে। এই ঘটনার পর উপজেলা প্রশাসনের গঠন করা তদন্ত কমিটির সদস্যরা গত বুধবার দুপুর ১২টায় মাদ্রাসা ক্যাম্পাস পরিদর্শন করেন।
তদন্ত কমিটির সদস্য জগন্নাথপুর উপজেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন অফিসার নব কুমার সিংহ বলেন, গত বুধবার দুপুর ১২টার দিকে আমরা মাদ্রাসা ক্যাম্পাস সরেজমিনে পরিদর্শন করি। বিকেল ৫টা পর্যন্ত ওই এলাকায় পরিদর্শন করেছি। আমরা দেখেছি, চামড়া পুঁতে রাখা জায়গা থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। মাটির নিচে গ্যাসের কারণে চামড়াগুলো ফুলে ওঠে মাটি ভেদ করেছিল। পরে ব্লিচিং পাউডার বালি ও মাটির আস্তর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। তদন্ত কমিটি মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটি, শিক্ষক ও স্থানীয় এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলেন। তারা জানান, সংগৃহীত চামড়া বিক্রি করতে না পারায় পরিবেশ রক্ষা করতে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে। তদন্ত কমিটি লিখিত প্রতিবেদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহফুজুল আলম বলেন, বিকেলে আমি মাদ্রাসা ক্যাম্পাস পরিদর্শন করে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও এলাকাবাসীসহ অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। ম‚লত ক্রেতা না পাওয়ায় ও চামড়া থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়ার কারণে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সংগৃহীত চামড়াগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলেন। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সিলেটে চামড়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিল, কিন্তু তারাও কিনতে রাজি না হওয়ায় মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ নিরুপায় হয়ে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চামড়ার গন্ধে যেন এলাকার পরিবেশ দ‚ষিত না হয়, সেজন্য প্রশাসন ১০ কেজি ব্লিচিং পাউডার, মাটি ও বালির আস্তর এবং পলিথিন দিয়ে চামড়া পুঁতে ফেলার জায়গা ঢেকে দিয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন রাতেই (১৪ আগস্ট) জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে।
উলে­খ্য, মঙ্গলবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে সৈয়দপুর সাহারপাড়া ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামের সৈয়দপুর হাফিজিয়া হোসাইনিয়া দারুল হাদিস মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ৮০০ পিস গরুর চামড়া ও ৯৫ পিস ছাগল,বকরি ও ভেড়ার চামড়া মাটির নিচে পুতে ফেলেন।
মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা সৈয়দ ফখরুল ইসলাম জানান, চামড়াগুলো বিক্রির জন্য অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু, কোনও ক্রেতা পাওয়া যায়নি। তাই মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ তৈয়ব মিয়া কামালীকে প্রধান করে উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর লতিফুল বারী ও উপজেলা ফায়ার স্টেশনের স্টেশন অফিসার নব কুমার সিংহকে সদস্য করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।