| |

Ad

চাকরির নামে অদম্য প্রতারণার ফাঁদ!

আপডেটঃ ৫:৪৩ অপরাহ্ণ | আগস্ট ০৮, ২০১৯

বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাস থেকে শুরু করে অলিগলি, রাজধানী জুড়ে সবখানেই চোখে পড়ে বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণীয় চাকরির বিজ্ঞাপন। তা হলো- ‘পার্ট টাইম চাকরি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃতিপ্রাপ্ত গ্রুপ অব কোম্পানিতে সম্পূর্ণ অফিসিয়াল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কিছুসংখ্যক পুরুষ/মহিলা, ছাত্রছাত্রী আবশ্যক। সপ্তাহে তিন দিন, তিন ঘণ্টা। বেতন ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। ছাত্রছাত্রীদের অগ্রাধিকার।’
এরূপ খণ্ডকালীন চাকরি দেওয়ার নামে চলছে প্রতারণা। আর বিজ্ঞাপন দেখে প্রতারিত হচ্ছেন অনেকে। বিশেষ করে ঢাকায় নতুন আসা শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার পাশাপাশি টাকা আয়ের উৎস খুঁজতে গিয়ে এসব প্রতারণার ফাঁদে পড়ছেন। 
এ ধরনের একটি বিজ্ঞাপনে দেওয়া মুঠোফোন নম্বর দেখে চাকরির জন্য যোগাযোগ করা হলে এ প্রতিবেদককে মিরপুর শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে ফোন করতে বলা হয়। সেখানে গিয়ে যোগাযোগ করলে একটি ভবনের চতুর্থ তলায় যেতে বলা হয়। ওই ভবনের চতুর্থ তলায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কোনো কোম্পানি বা কোনো শাখা কার্যালয় নেই। রুমের ভেতরে ইন করে চেয়ারে বসে আছেন একজন। বাইরে ২/৩ জন পায়চারি করছে। 
কক্ষের ভেতরে বসে থাকা ব্যক্তি নিজেকে কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বলেন, চাকরি করতে হলে প্রথমে সাক্ষাৎকার দিতে হবে। পদ হবে সহকারী ব্যবস্থাপকের। যারা অফিসে আসেন, তাদের কাজ বোঝানোই কাজ। বেতন ছয় হাজার টাকা। সাক্ষাৎকারে উত্তীর্ণ হলে ৫০০ টাকা দিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। টাকা সঙ্গে না থাকলে সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে না। এরপর দুই দিনের প্রশিক্ষণ। এ জন্য দিতে হবে আরো দুই হাজার টাকা। প্রশিক্ষণের পর একটি বিমা সংগ্রহ করে দিতে হবে। তারপর চাকরি। আর তা না পারলে চাকরিও হবে না। কোনো টাকাও ফেরত দেওয়া হবে না। 
৫০০ টাকা কেন জানতে চাইলে তিনি জানান, কোম্পানির পক্ষ থেকে পরিচয়পত্র, আইডি কার্ড দেওয়া ও নিবন্ধনের জন্য এই টাকা। আর বাকি টাকা প্রশিক্ষণের জন্য। বুঝার বাকি নেই যে, এটি প্রতারণার ফাঁদ মাত্র। অনেক ক্ষেত্রে আবার প্রতিষ্ঠানের নামও উল্লেখ থাকে। কিন্তু ওই কোম্পানির কী কাজ তা স্পষ্ট নয়। আবার বলা হয়, এটি শাখা কার্যালয়, এখানে শুধু নিয়োগ দেয়া হয়। হেড অফিস অন্য জায়গায়। 
এ ধরনের চাকরি করতে গিয়ে প্রতারণার শিকার একাধিক শিক্ষার্থী জানান, শেষ পর্যন্ত এভাবে কেউ চাকরি পান না এবং কিছু অর্থ খরচ করার পর খালি হাতে ফিরে আসতে হয়। 
কবি নজরুল কলেজের অর্নাস তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আব্দুল্লাহ মামুন জানান, ফার্মগেট আনন্দ সিনেমা হলের পাশে রাস্তার দেয়ালে খণ্ডকালীন চাকরির একটি বিজ্ঞাপনে (ডিএক্স প্রা. লি.) শুধু একটি মুঠোফোন নম্বর দেওয়া ছিল। গত ৯ এপ্রিল যোগাযোগ করলে পরদিন ফার্মগেটের মালেক টাওয়ারের নবম তলায় গিয়ে যোগাযোগ করতে বলা হয়। সেখানে গিয়ে তিনি কোনো প্রতিষ্ঠানের নামফলক পাননি। অভ্যর্থনা কক্ষে থাকা একজন তাকে জানান, তিনি ঠিক জায়গায় এসেছেন। এরপর একজন নিজেকে ফয়সাল বাদশা পরিচয় দিয়ে মৌখিক পরীক্ষা দিতে বলেন। টিকলে তবেই চাকরি। বেতন চার হাজার টাকা। সাক্ষাৎকারের পর বিবেচিত হলেন মামুন। 
কী চাকরি জানতে চাইলে তাকে জানানো হল, গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলা ও সদস্য বাড়ানো। আর এ জন্য বেশ কিছু বিজ্ঞাপন নগরের বিভিন্ন জায়গায় লাগাতে হবে। অফিসে সময় দিতে হবে সপ্তাহে তিন দিন তিন ঘণ্টা করে। তবে এর আগে ৫৫০ টাকা দিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। টাকা না থাকার কথা জানালে ১০০ টাকা অগ্রিম দিতে বলা হয়। তখন মামুন প্রতারণা বুঝতে পেরে পালিয়ে আসেন। মামুন টাকা না দিলেও অনেকেই টাকা দিয়ে আসেন চাকরি পাওয়ার আশায়। 
একইভাবে প্রতারিত রিদি জানান, সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর দুই দিনের প্রশিক্ষণ শেষে চাকরিতে যোগ দেওয়ার কথা বলা হয়। রিদি বলেন, পরদিন তারা বলে, আড়াইশ টাকা দিয়ে নাম নিবন্ধন করতে হবে। টাকা দেওয়ার পর বলা হয়, ছয় হাজার টাকা দিয়ে নিজের একটি বিমা করতে হবে। বেতন থেকে এ অর্থ কেটে রাখার কথা বললে তারা জানিয়ে দেয়, টাকা না দিলে কোনো চাকরি হবে না। পরে তারা দুর্ব্যবহার করলে বাধ্য হয়ে চলে আসি। 
বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করে দেখা যায়, সবই প্রায় একই ধাঁচের। বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে ‘জামানত নিষ্প্রয়োজন’ বা বেতনের পরিমাণও উল্লেখ থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোম্পানির নাম উল্লেখ করা হয় না। যোগাযোগের ঠিকানাও দেওয়া হয় না। থাকে কেবল একটি মুঠোফোন নম্বর। 
তবে অনেকের অভিযোগ, এ ধরনের প্রতারক চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের সখ্যতা থাকে। তাই প্রতারিত হয়েও চাইলে কেউ তাদের কিছু করতে পারে না। 
তবে দুই থানাধীন (কাফরুল ও তেজগাঁও) ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানার ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, মাঝেমধ্যে তাদের কাছে চাকরির নামে প্রতারণার অভিযোগ আসে। কেউ কেউ সাধারণ ডায়েরি করে। পরে ঠিকানা অনুযায়ী অভিযানে গেলে দেখা যায়, ওই অফিস খালি কিংবা অন্য কোন অফিস। 
এরূপ চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়া চক্রের সদস্যদের প্রায় গ্রেফতার করে র‌্যাব। গত ১৭ এপ্রিলও মিরপুর ও খিলক্ষেত থেকে ১৬ জনকে আটক করে র‌্যাব-১। 
র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল এমরানুল হাসান বলেন, বেকারত্বের কারণে অনেকে বিজ্ঞাপন দেখেই চাকরি নিতে গিয়ে প্রতারিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই। আর কেউ প্রতারণার শিকার হলে সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।