| |

Ad

দালাল চক্রের দৌরাত্ব্যে অবৈধ পথে স্বপ্নের ইউরোপ বনাম ভূমধ্যসাগরে সলীল সমাধী! সাংবাদিক এম.জি.ছরওয়ার

আপডেটঃ ৩:৩১ অপরাহ্ণ | জুন ১৫, ২০১৯

নিজস্ব প্রতিবেদক: স্বপ্ন যখন অবৈভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর তখন আন্তর্জাতিক দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে সাগরের অথই জলে সলিল সমাধী ঘটতেছে বাংলাদেশ-সহ বিভিন্ন দেশের হাঁজার হাঁজার মানুষের। তবুও এই অভিবাসীদের বাঁধ ভাঙ্গা স্রোত কোন ক্রমেই ঠেকাতে পারছে না লিবিয়ার ও ইতালীর সমুদ্রে কর্মরত থাকা কোষ্ট গার্ডের সদস্যরা।

সম্প্রতি অবৈধ পথে ইতালী পাড়ি দিতে গিয়ে তিউনিশিয়ার উপকূলে নৌকাডুবিতে সলিল সমাধি হয়েছে বাংলাদেশের সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের আহমদ, লিটন ও আজিজ সহ দেশের বিভিন্ন জায়গার অন্তত ৩৯ জন। ভূমধ্যসাগরে তিউনিশিয়ার উপকুলে অভিবাসীবাহী নৌকাডুবির ঘটনায়  ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া ১৫ বাংলাদেশী যুবকরা এখন ধীরে ধীরে দেশে ফিরতে শুরু করেছেন।

জাতিসংঘের অান্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইএমও) তত্বাবধানে এবং রেড ক্রিসেন্টের সহযোগীতায় তারা দেশে ফেরেন। দেশে ফেরার পর বিলাল আহম্মদের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি চ্যানেল সেভেন বিডি ডটকমকে জানান, নিজে বেঁচে দেশে ফিরলেও তার চোখের সামনেই আপন ভাগ্নে আহমদ হোসেন, দুই ভাতিজা আব্দুল আজিজ ও লিটন আহমেদ ভূমধ্যসাগরে ডুবে মারা যান।

তাদেরকে চোখের সামনে ডুবে যেতে দেখেছেন তিনি। তিনি বলেন, তাদের নৌকাটি লিবিয়ার উপকুলয়ীয় অঞ্চল থেকে প্রায় দুই শতাধিক অভিবাসী নিয়ে ভূমধ্যসাগরে ছুটে চলে। কিছু দূর যাওয়ার পর সাগরের মধ্যে আমাদের বহর নৌকাটির ইনজিন হঠাৎ করে বিকল হয়ে যায়। এর পর তারা ভূমধ্যসাগরে ভাসতে থাকে। নৌকাটির অবস্থা একপর্যায়ে ডুব ডুব ভাব মনে হয়। তার বর্ণনানুযায়ী, ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। নষ্ট নৌকাটি ভাসতে ভাসতে যখন সাগরের মাঝ খানে চলে আসে, তখন নৌকটি একপর্যায়ে হাঠাৎ করে কাত হয়ে উল্টে যায়।

মুহুর্তে মানুষ গুলো বাঁচর জন্য ছটফট করতে থাকে। ডুবে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে আমরা সবাই হুড়োহুড়ি করে নৌকাটি ধরে রাখার চেষ্টা করি। একজন আরেক জনের উপর উঠে নৌকাটি ধরে রাখার চেষ্টা করি। কেউ কেউ একজন আরেক জনের ঘাড়ে ভর করে বাঁচার জন্য মাথা পানির উপর ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল। প্রথমে একজন আরেক জনকে বাঁচাতে জড়াজড়ি করেও ধরে রাখে। বেশি পানিতে সাতার কেটে ভেসে থাকার লড়াইটা যখন আর চালানো যাচ্ছিলো না, যখন মনে হচ্ছিল দম ফুঁরিয়ে আসছে ঠিক তখন আরেক জন কাছ থেকে সরিয়ে দিয়ে একাই বাঁচার চেষ্টা করি। কিছু সময়ের পর দেখি আমার চেয়ে কম ওজনের যে ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরে ছিলাম, সে পানির মধ্যে একাই ছটফট করতে করতে এক সময় নিস্তেজ হয়ে পানিতে তলিয়ে যায়। তখন দেখা যায় ঐ  সময় ঠান্ডা পানিতে ডুবে একে একে আরো অনেকে মারা যায়। ভাগ্যক্রমে ১১ ঘণ্টা সাগরের পানিতে ভেসে থেকে প্রাণ-পন চেষ্টায় বেঁচে যান বিলাল আহম্মদ। বেঁচে যাওয়া এই বাংলাদেশী নিজে বাঁচলেও চোখের সামনেই অনেক সহযাত্রীকে ডুবে মরতে দেখেছেন।

তিনি নিজেও ভূমধ্যসাগরের ঠান্ডা পানিতে ডুবে মরার উপক্রম হয়েছিলেন। তার পর একদল জেলে এসে তাকে উদ্ধার করেন। তিনি বলেন, বেঁচে থাকার সব আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। তার পর আল্লাহ যেন আমাদের বাঁচাতে জেলেনৌকা পাঠালেন। তিউনিশিয়ার জেলেরা যদি আমাদের দেখতে না পেতেন তাহলে আমরা কখনই জীবিত থাকতে পারতাম না এবং ভূমধ্যসাগরে এই নৌকাডুবির ঘটনা কখনই কেউ জানতে পারতো না। এই দুঃসহ স্মৃতি তাকে এখনো তাড়া করছে। ইচ্ছা করলেও তিনি এখন স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে পারছেন না। লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি থেকে বেঁচে বাংলাদেশে ফেরার পর লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন বিলাল আহম্মদ (৩২)।

বিলাল আহম্মদ আরো বলেন, তিউনিশিয়ার নেভি ও জেলেরা ১৫ বাংলাদেশীকে উদ্ধার করেন। তাদের উদ্ধারের পর তিউনিশিয়ার উপকুলীয় শহর জারজিসে রেড ক্রিসেন্টের একটি আশ্রয় কেন্দ্রে রাখা হয়। পরবর্তিতে রেড ক্রিসেন্ট তাদের চিকিৎসা দেয়। আইএমও তাদের দেশে ফেরাতে কাজ শুরু করেন। তিনি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মউদপুর গ্রামের মৃত তজম্মুল আলীর ছেলে। তিনি কিছু দিন আগে বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টা ৩৮ মিনিটে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের টিকে-৭১২ ফ্লাইট যোগে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। সেখানে ১ দিন বিভিন্ন সংস্থার লোকদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে অবশেষে পরের দিন বাড়ি ফেরেন। বিলাল আহম্মদ বলেন, দালালচক্র ভারত, শ্রীলঙ্কা, কাতার, ওমান, ইস্তামবুল হয়ে তাদের নিয়ে যায় লিবিয়ায়। লিবিয়ায় জিম্মি করে কয়েক মাস চলে অমানুষিক নির্মম নির্যাতন। পাসপোর্ট ছিনিয়ে নিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয় তাদের দেশে ফিরে আসার পথও। অবশেষে প্রতিজনের পরিবারের কাছ থেকে চুক্তি অনুযায়ী ৮ লাখ টাকা আদায়ের পর আরও কয়েক লাখ টাকা আদায় করে নিয়ে ইতালির উদ্দেশ্যে তাদের তুলে দেয়া হয় লিভিয়ার   রাবারের নৌকায়। অল্প কিছু দূর গিয়েই ডুবে যায় তাদের বহনকারী নৌকাটি।

বিলাল আবেগা জড়িত কণ্ঠে বলেন, লিবিয়ায় আরো অন্তত ২শ’র ও অধিক বাংলাদেশি তরুণকে এই পথে ইতালিতে পাঠাতে জড়ো করে রেখেছে পাচারকারী চক্রটি। অতিরিক্ত টাকার জন্য তাদের উপর চালাচ্ছে নির্মম নির্যাতন। চুক্তি অনুযায়ী দালালরা কথা রাখেননি। তারা ইতালিতে পাঠানোর লোভ দেখিয়ে আসলে লিবিয়ার দালালদের কাছেই তাদের বিক্রি করছে। বিলাল বলেন, এখন দাবি শুধু একটাই। আর সেটি হচ্ছে এই দালাল চক্রের কঠোর শাস্তি চাই। পাশাপাশি লোভে কেউ যেন দালালদের প্রতারণায় না পড়েন এই আহ্বানও করেন তিনি। উল্লেখ্য লিবিয়ার জুয়ারা থেকে অবৈধভাবে ইতালিতে যাওয়ার পথে ১০ মে তিউনিসিয়া উপকূলে নৌকা ডুবে বহু মানুষের মৃত্যু হয়। নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজ ৩৯ বাংলাদেশির একটি তালিকা সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের জামায়াত নেতা এনামুল হক সহ পাচারকারী চক্রের তিন সদস্যকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে ঢাকা র‌্যাবের সদস্যরা। এ ছাড়া সাগরে নৌকা ডুবে নিহত একজনের পরিবারের পক্ষ থেকে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় ও বিশ্বনাথ থানায় আরেক জন পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছেন।

বেলালের ভাষ্যমতে জানাজায়, অধিকাংশ দক্ষিন অাফ্রিকান ও নাইজেরিয়ান নাগরিকরা সহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা তাদের ছোট ছোট শিশু বাচ্ছা সাথে নিয়ে ঝুঁকিতেই অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিলেও অধিকাংশ লোকজন ইনজিন বিহীন প্লাস্টিকের নৌকায় ভূমধ্যসাগরের সীমাহীন ঢেউয়ের তোড়ে পড়ে গভীর জলে ডুবে গিয়ে প্রতিনিত সলিল সমাধী ঘটতেছে অহরাহর। বিলাল আরো জানান, এ দেশীয় দালাল, দালালেরাই সহজ সরল স্বল্প আয়ের মানুষদেরকে মিথ্যা চাটুকারিতার ফাঁদে পেলে বিলাসিতার স্বপ্ন দেখিয়ে নিরীহ মানুষজনের সহায়-সম্পদ, বিটে-মাটি, ব্যাংক-বীমা নষ্ট করে কুটি কুটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে কখনো সাগর পথে কিংবা গহীন জঙ্গল পথে দূর দেশের অান্তর্জাতিক দালাল চক্রের হাতে তুলে দিচ্ছে।

দালালদের সীমাহীন নির্মম শারীরিক নির্যাতনের ফলে অনেকে এখন  মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। আমরা চাই সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ঐসব দালাল চত্রুের মানব পাচারকারীদেরকে  গ্রেফতার করে দেশের সহজ-সরল মানুষদেরকে ভূমধ্যসাগর পথে জীবন  সলীল সমাধী কিংবা গহীন জঙ্গলে জীবন্ত প্রাণ বির্সজনের হাত থেকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসবেন।